রায়ে যে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী

29
Print Friendly, PDF & Email

ঋত্বিক তারিক, ঢাকা:

রাষ্ট্রের স্বার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্ত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিবেচনায় পিলখানা হত্যা মামলাটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি ফৌজদারী মামলা। দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিডিআর সদরদপ্তরে নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় বিষয়ে হাইকোর্টের বৃহত্তর বিশেষ বেঞ্চের বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তাঁর সুদীর্ঘ রায়ে ঐতিহাসিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, বাহিনীর অসামান্য ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা, তাৎপর্য এবং গুরুত্ব উল্লেখ করে দিয়েছেন নানা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকীর লেখা ২৭ লক্ষ ৯০ হাজার ৪৬৮ শব্দের যুগান্তকারী এ রায় বিশ্বের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ হিসেবে ইতোমধ্যেই একটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট উন্মুক্ত আদালতে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিল। তার দুই বছর পর গত ৮ জানায়ারি পূর্ণাঙ্গ এ রায় এল।

রায়ে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার আলাদাভাবে মোট ২২ দফা সুপারিশ করেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক শওকত হোসেন এসব সুপারিশে সহমত পোষণ করেন।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরে বিদ্রোহ দেখা দেয়। ঢাকার পিলখানায় বাহিনীর সদরদপ্তরে বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে মারা যান ৫৭ সেনা কর্মকর্তা। রক্তাক্ত সেই বিদ্রোহে বেসামরিক ব্যক্তিসহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে জওয়ানদের বিদ্রোহ।

বিচারপতি সিদ্দিকীর বাংলায় লেখা ১৬ হাজার ৫৫২ পাতার রায়ে মামলার প্রেক্ষাপট, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও নৃশংসতার সচিত্র পর্যবেক্ষণ, প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক আইনের প্রয়োগ এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের সঙ্গে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার একমত পোষণ করেছেন।

প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবিধান সম্মতভাবে আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে মামলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই মামলায় প্রদত্ত রায়কে প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভবিষ্যতের জন্যে একটি নির্মোহ দৃষ্টান্ত হিসাবে মন্তব্য করেছেন বিচারপতি সিদ্দিকী।

জনস্বার্থ বিবেচনা করে বিচারপতি সিদ্দিকী প্রদত্ত রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণ জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা নিউজবিটোয়েন্টিফোর ডটকম এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো একাদশ তম কিস্তি।

বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী তার রায়ে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন:

১। (ক) বাংলাদেশ রাইফেলসের নিরাপত্তা বিষয়ক ইউনিট RSU বিজিবির মেধাবী, সৎ ও চৌকস সদস্যের সমন্বয়ে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো এবং ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ তারিখে পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে দায়িত্বে অবহেলার জন্যে ঘটনাকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা RSU এর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা।

(খ) ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ তারিখে বাংলাদেশ রাইফেলসের মহাপরিচালকের দরবারে সশস্ত্র আক্রমন এবং পিলখানায় মর্মান্তিক হত্যাকন্ডের ঘটনার পূর্বাভাস সংগ্রহে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে ব্যর্থতার জন্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাসহ দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা।

২। (ক) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৪/০২/২০০৯ তারিখে পিলখানায় বাংলাদেশ রাইফেলসের কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহন করেছেন, অথচ সরকারের সংশ্লিষ্ঠ গোয়েন্দা বাহিনী ও নিরাপত্তা কর্মীদের বাহ্যিক তৎপরতা দৃশ্যমান হলেও ভেতরে অন্তস্বার শুন্যতা পলিক্ষিত হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অধিকতর সতর্ক করা।

(খ) বিডিআরে তীব্র অসন্তোষ এবং প্রকাশ্যে লিফলেট বিতরন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাসহ কমান্ডিং অফিসারদের নজরে আসা সত্বেও তারা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহনে উদ্যোগ গ্রহণ না করে উদাসীতার পরিচয় দিয়েছে। ভবিষ্যতের জন্যে সংশ্লিষ্টদের মনোযোগী ও সতর্ক হওয়া।

৩। (ক) মানবিক গুনাবলী সম্পন্ন মেধাবী, দূরদৃস্টি সম্পন্ন দক্ষ, তড়িৎ ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে পারদর্শী, উপযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে বিজিবির মহাপরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রেষনে নিয়োগের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করা।

(খ) বিজিবির অফিসারসহ সকল পদের সদস্যদের মানবিক গুনাবলী, দায়িত্ব, কর্তব্য, বিভাগীয় আইন ও শৃঙ্খলা সম্পর্কিত প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহনের কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহন করা।

৪। (ক) সামরিক/বেসামরিক সকল শ্রেণীর কর্মকর্তাদের বৃটিশ আমলের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব পরিহার করে সকলকে সেবার মানসিকতা নিয়ে দেশ প্রেমের সাথে কাজ করার প্রশিক্ষন প্রদান করা।

(খ) ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়া এবং বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সংগ্রামে পেশা, পদবী, সামাজিক পরিচায়কে প্রাধান্য না দিয়ে সংবিধানে উল্লেখিত মূলনীতি অনুস্বরন করে সকলের প্রতি মানবিক আচরন ও সম্মান প্রদর্শনের মানষিকতায় বাহিনীকে গড়ে তোলা।

৫। (ক) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিজিবিসহ অধীনস্থ সকল বাহিনীর সদস্যদের সুবিধা/অসুবিধা সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় আন্তরিকতা ও বিচক্ষনতার সাথে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

(খ) বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টির পূর্বেই কর্তৃপক্ষের আইন সম্মত ও সম্মানজনক উপয়ে তার সমাধান খুঁজে বের করা।

৬। (ক) বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে চাকুরী বিধি মতে মর্যাদার পার্থক্য যতদুর সম্ভব কমিয়ে আনা এবং সকলকে সংবিধান সম্মত উপায়ে আইনানুগভাবে সম্মানের সাথে প্রজাতন্ত্রের চাকুরী করার সুযোগ সৃষ্টি করা।

(খ) বিজিবির সদস্যদের পদোন্নতি, বেতন, ভাতা, রেশন, ছুটি, আবাসিক সমস্যা, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষা গ্রহনের সুবিধাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে উদ্ভুদ সমস্যা দ্রুত সমাধানে মন্ত্রনালয়সহ সরকারের সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহন করা।

৭। (ক) আইনানুগ কোন বাধা না থাকলে অন্যান্য বাহিনীর ন্যায় বিজিবির সদস্যদের জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশ গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহন করা।

(খ) বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের প্রতি সম-আচরন করা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডিং অফিসার কর্তৃক অধীনন্তদের প্রতি আত্মমর্যাদা হানিকর যে কোন আচরন থেকে বিরত থাকা, কারন তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।

৮। (ক) ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ তারিখে পিলখানায় নিহত সামরিক, আধা-সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরন প্রদান করা।

(খ) সেনা কর্মকর্তাসহ নিহতদের সন্তান বা পরিবারের উপযুক্ত সদস্যদের আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তা বিধানে যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকুরীর ব্যবস্থা গ্রহন করা।

(গ) সামরিক কর্মকর্তাসহ নিহতদের সম্মানে পিলখানাসহ দেশের সকল সেনানিবাস, বিজিবির সকল সেক্টর হেড কোয়ার্টারে নাম ফলক নির্মান করা।

৯। (ক) পুর্নগঠিত বিজিবি সংবিধান ও নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে দেশের সীমান্ত রক্ষাসহ তাদের উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব পেশাদার বাহিনী হিসাবে দেশ-প্রেম, সততা ও শৃঙ্খলার সাথে পালনের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বিজিবির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা।

(খ) দেশের সীমান্তরক্ষী হিসাবে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রাথমিক নিরাপত্তা বাহিনীর (First Defense Force) দায়িত্বে থাকা বিজিবিকে শক্তিশালী বাহিনী রুপে গড়ে তোলার কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহন করা।

১০। (ক) সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীকে ‘অপারেশন ডাল ভাতের’ ন্যায় অন্য কোন আর্থিক সর্মসূচীতে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত পরিহার করা। আর্থিক লেনদেন ও লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যে অহেতুক বিভেদ ও নৈতিক স্খলনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ রাইফেলসের ক্ষেত্রে ‘অপারেশন ডালভাত’ উৎকৃষ্ট উদাহরন।

(খ) পিলখানা হত্যাকান্ডে ‘ঘটনার পিছনের ঘটনা’ উৎঘাটন করে জাতির সামনে প্রকৃত স্বার্থন্বেষী মহলের চেহারা উন্মোচনের জন্যে জনস্বার্থে সরকার প্রয়োজন মনে করলে আইনানুগভাবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারা তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা।

১১। (ক) সমাজের সকলস্তরে নৈতিকতা পুনরুদ্ধার ও জাতিগঠনের জন্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষায় বাধ্যতামূল নীতিশাস্ত্র (Ethics) শিক্ষাদান অতি জরুরী। নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সমাজের প্রতিটি স্তরে অসম প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নীতিশাস্ত্রের (Ethics) অধ্যায়ন বাধ্যতামূলক হওয়া অপরিহার্য্য।

(খ) রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বসবাস উপযোগী উন্নত ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে নিজ নিজ ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুশাসনে শিশুদের চরিত্র গঠনের মাধ্যমে মানবিক গুনাবলী সম্পন্ন হিসাবে গড়ে তোলার বিশুদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্যে অত্যন্ত জরুরী। (চলবে)