পিলখানা হত্যা মামলার রায়ে কোরআন থেকে যে উদ্ধৃতি দিলেন বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী

32
Print Friendly, PDF & Email

ঋত্বিক তারিক, ঢাকা:
রাষ্ট্রের স্বার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্ত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিবেচনায় পিলখানা হত্যা মামলাটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি ফৌজদারী মামলা। দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিডিআর সদরদপ্তরে নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় বিষয়ে হাইকোর্টের বৃহত্তর বিশেষ বেঞ্চের বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তাঁর সুদীর্ঘ রায়ে ঐতিহাসিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, বাহিনীর অসামান্য ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা, তাৎপর্য এবং গুরুত্ব উল্লেখ করে দিয়েছেন নানা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকীর লেখা ২৭ লক্ষ ৯০ হাজার ৪৬৮ শব্দের যুগান্তকারী এ রায় বিশ্বের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ হিসেবে ইতোমধ্যেই একটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট উন্মুক্ত আদালতে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিল। তার দুই বছর পর গত ৮ জানায়ারি পূর্ণাঙ্গ এ রায় এল।

রায়ে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার আলাদাভাবে মোট ২২ দফা সুপারিশ করেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক শওকত হোসেন এসব সুপারিশে সহমত পোষণ করেন।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরে বিদ্রোহ দেখা দেয়। ঢাকার পিলখানায় বাহিনীর সদরদপ্তরে বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে মারা যান ৫৭ সেনা কর্মকর্তা। রক্তাক্ত সেই বিদ্রোহে বেসামরিক ব্যক্তিসহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে জওয়ানদের বিদ্রোহ।

বিচারপতি সিদ্দিকীর বাংলায় লেখা ১৬ হাজার ৫৫২ পাতার রায়ে মামলার প্রেক্ষাপট, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও নৃশংসতার সচিত্র পর্যবেক্ষণ, প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক আইনের প্রয়োগ এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের সঙ্গে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার একমত পোষণ করেছেন।

প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবিধান সম্মতভাবে আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে মামলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই মামলায় প্রদত্ত রায়কে প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভবিষ্যতের জন্যে একটি নির্মোহ দৃষ্টান্ত হিসাবে মন্তব্য করেছেন বিচারপতি সিদ্দিকী।

জনস্বার্থ বিবেচনা করে বিচারপতি সিদ্দিকী প্রদত্ত রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণ জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা নিউজবিটোয়েন্টিফোর ডটকম এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো দশম কিস্তি।

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী পর্যবেক্ষনে বলেছেন, পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৯৩ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, “ওয়ামাই ইয়াকতুল মু’মিনাম মুতাআম্মিদান ফাজাঝাউহু জাহান্নামু খালিদান ফিহা, ওয়া গাদিবাল্লাহু আলাইহি ওয়া লা আনাহু ওয়া আয়া’দ্দা লাহু আজাবান আযিমা” অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন ঈমানদারকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম সে চিরকাল সেখানেই থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন ঈমানদারকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম, সে চিরকাল সেখানেই থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। হাদীসে এসেছে, ওহুদের যুদ্ধ চলাকালে একজন মুসলমান অপর এক মুসলমানকে ব্যক্তিগত শক্রতার জের হিসাবে হত্যা করে। আমাদের মহানবী রাসূলে করিম (সঃ) (আঃ) ওহীর মাধ্যমে এ সম্পর্কে অবহিত হন এবং যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে হত্যাকারীকে কিসাস করার অর্থাৎ অনুরূপ শাস্তি দেয়ার নির্দেশ দেন এবং তার ক্ষমা প্রার্থনাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।”

পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারার ১৭৯ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। ‘ওয়ালাকুম ফিল কিসাসি হায়াতুই ইয়া উলিল কাল্বাব।’ অর্থ হচ্ছে, ‘হে বুদ্ধিমানগণ কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্যে জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।’ অনেকে কিসাসের আইনের প্রভাবের দিকে লক্ষ্য না করে প্রশ্ন করে যে, হত্যাকারীকে হত্যার ফলে কি নিহত মানুষ জীবিত হবে? এবং কিসাসের ফলে আরেকজন মানুষকেই তো হত্যা করা হলো, এই প্রশ্ন সমকালিন বিশ্বে মানবাধিকারের নামে আলোচিত হচ্ছে। পবিত্র কোরআনে এ সকল প্রশ্নের জবাবে একটি মৌলিক দিকের কথা উল্লেখ করেছে যে, মানুষের জীবন ন্যায় বিচার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সম্ভব নয়। আর এ দুটি বিষয় প্রতিষ্ঠার জন্যে হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে। যেমনটি কোন ব্যক্তির সুস্থতার জন্যে শরীরের কোন পচনশীল অংশ কেটে ফেলা জরুরী। মূলতঃ কিসাসের বিধান ব্যক্তিগত প্রতিশোধের চেয়ে সামাজিক নিরাপত্তার জন্যেই বেশী জরুরী।

সূরা মায়েদার ৪৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে; “ওয়া কাতাবনা আলাইহিম ফিহা আন্নান নাফসা বিন নাফসি ওয়াল আইনা বিল আইনি ওয়াল আনফা বিল আনফি ওয়াল উজুফা বিল উজুনি ওয়াস সিন্না বিস সিন্নি ওয়াল জুরুহা ক্বিসাস, ফামান তাসাদ্দাকা বিহি ফাহুয়া কাফফারাতুল্লাহ, ওয়ামাল লাম ইয়াহকুম বিমা আনযালাল্লাহু ফা উলাইকা হুমুয যালিমুন” অর্থ হচ্ছে, আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখম সমূহের সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।

অবশ্য হত্যার মত অপরাধে জড়িত ব্যক্তির মত অপরাধীদেরও সমাজের জন্যে ক্ষতিকর না হলে অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া একটি পছন্দনীয় কাজ। তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ পাক বলেছেন যারাই কিসাস বা প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ থাকা সত্বেও অপরাধীকে ক্ষমা করবে, মহান আল্লাহও তাদের পাপ ক্ষমা করবেন।

এ আয়াত থেকে মনে রাখা দরকারঃ (১) আইনের দৃষ্টিতে জাতি ধর্ম, জ্ঞানী, মূর্খ ও ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষ সব মানুষই সমান, (২) কিসাসের বিধান শুধু ইসলাম ধর্মেরই নিজস্ব বিধান নয়, হযরত মূসা (আঃ) এর যুগ থেকে এ বিধান প্রচলিত হয়েছে এবং এখনও তা অব্যহত রয়েছে, (৩) শুধু অর্থ-সম্পদ দান করাই সদকা নয়, অন্যদের ভুল ও অপরাধ ক্ষমা করাও এক ধরনের সদকা, (৪) ইসলাম অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও কঠোরতার পাশাপাশি দয়া ও অনুগ্রহও দেখায়, (৫) কারাদন্ড ও অর্থদন্ড বা জরিমানা অবৈধ হত্যাকান্ডের মত অপরাধের চালিকা শক্তিগুলোকে প্রতিরোধের জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই হত্যার বিনিময়ে মৃত্যুদন্ডের বিধান সমাজের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যে জরুরী।

পর্যবেক্ষনে প্রখ্যাত মনিষীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “বিচারকের কেবলমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে, অপরাধ তথা অপরাধীকে সনাক্ত করা; শাস্তির প্রসঙ্গটি আইনের বিষয় এবং আইনই শাস্তি নির্ধারণ করে থাকে।” লর্ড হিউওয়ার্টের মতে “ন্যায় বিচার শুধুমাত্র করলেই চলবে না, ন্যায় বিচার যে করা হয়েছে তা প্রতীয়মান হওয়া চাই।” সেন্ট এ্যাকুইনাসের মতে, “বিচার পরিচালনার কার্যে বিচারকের নিরপেক্ষ ভূমিকা যেমন ন্যায় বিচারের জন্যে অতীব প্রয়োজনীয়, তেমনি বিচারকের রায় আইনসম্মত পদ্ধতিতে গৃহীত হয়েছে বলেও প্রমানিত হওয়া আবশ্যক। প্রতিহিংসা কিংবা পক্ষপাতিত্ব যেন বিচারের শ্রদ্ধাবোধ বিনষ্ট না করে। দন্ডের সাথে, দন্ডদাতা কাঁদে সমান আঘাতে, সর্বশ্রেষ্ঠ যে বিচার।” অপরাধ বিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ব নিয়ে ফ্রাঞ্জ আলেকজান্ডার তার গবেষণায় বলেছে, “পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষই জন্মগত অপরাধী। মূলতঃ পৃথিবীতে মানুষের আগমন ঘটে অপরাধী হিসেবে, এটাই তার অনিবার্য নিয়তি। জন্মের পর শিশুর ভিতর আদিম ও সহজাত প্রবৃত্তিগুলো কার্যকর থাকে, শুধুই নিজের সুখ ও আত্মতৃপ্তি খুঁজে ফিরে যে, পরিহার করতে চায় দুঃখকে। চার থেকে ছয় বছরের শিশুর মধ্যে সামাজিক নৈতিকতার পটভূমি তৈরি হয়, ফলে যে ভাল-মন্দ অথবা অপরাধী ও নিরপরাধী সম্পর্কিত ধারণা লাভ করতে থাকে।” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “আমার আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষনমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে “সকল নাগরিকের জন্যে আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।;” (চলবে)