নামাযে যে ৮টি ভুল প্রায়ই হয়

16
Print Friendly, PDF & Email

মাসুম বিল্লাহ, ডেস্ক রিপোর্ট:
নামায ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যে পাঁচটি মূল স্তম্ভের উপর পুরো ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম হল নামায। সুতরাং একজন ব্যক্তির ইসলামিক জীবন যাপনের সফলতা-ব্যর্থতা অনেকাংশেই তার নামাযের উপর নির্ভরশীল।

অনেক সময় নামাযীগণ এমন কিছু ভুল করে ফেলেন, যেগুলোকে না জানা থাকায় বা দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে ভুলও মনে করেন না। এভাবে নামায পরিপূর্ণরূপে আদায় হয় না। এতে যদিও নামাযের ফরয আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এ থেকে কোন কল্যাণ অর্জনে ব্যর্থ হন।

এ নিবন্ধে নামাযের এমন ৮টি ভুল উল্লেখ করা হল।

১. দ্রুত নামায আদায়

অনেকেই খুব দ্রুত নামায আদায় করেন। নামাযে ঠিকমত রুকু-সেজদা আদায় না করেই তারা নামায শেষ করেন। কিন্তু রাসূল (সা.) আমাদের যথাযথ আদবের সাথে সময় নিয়ে নামায আদায় করতে বলেছেন। তিনি সময় নিয়ে কিয়াম, রুকু, সেজদা ও বৈঠক করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) একবার মসজিদে প্রবেশ করেন। তার পরপরই অপর এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে নামায আদায় করেন। এরপর সে রাসূল (সা.) এর কাছে এসে তাকে সালাম করেন। রাসূল (সা.) তার সালামের জবাব নেওয়ার পর বলেন, “যাও, নামায পড়ো। তুমি নামায পড়নি।”

লোকটি ফিরে গিয়ে নামায আদায় করলো এবং নামায আদায় শেষে আবার রাসূল (সা.) কে সালাম করলো। রাসূল (সা.) তার সালামের জবাব নিয়ে বললেন, “যাও, নামায পড়ো। তুমি নামায পড়নি।”

এভাবে তিনবার তিনি লোকটিকে পুনরায় নামায পড়তে পাঠালেন। শেষে লোকটি বললো, “তার কসম যিনি আপনাকে সত্যের বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমি এর থেকে উত্তম আর কিছুই করতে পারবো না। আমাকে শিক্ষা দিন।”

রাসূল (সা.) তখন বলেন, “যখন তুমি নামাযে দাঁড়াবে, তখন তাকবীর দিবে। এরপর কুরআন থেকে তোমার জন্য সহজ কিছু পাঠ কর। এরপর রুকুতে যাও এবং রুকুতে সম্পূর্ণভাবে স্থির হয়ে নাও। এরপর স্থিরভাবে সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াও। এরপর সেজদায় যাও এবং সেজদায় সম্পূর্ণ স্থির হয়ে নাও। এরপর সেজদা থেকে উঠে স্থির হয়ে বস। এভাবে করে তুমি সম্পূর্ণ নামায আদায় করো।” [বুখারী, হাদীস নং: ৭৫৭; মুসলিম, হাদীস নং: ৩৯৭]

২. নামাযে অধিক নড়াচড়া করা

অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে একমত যে, নামাযে অধিক নড়াচড়া ও শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ানো নামাযকে নষ্ট করতে পারে। এটি যেমন ব্যক্তির নিজের নামাযের খুশুকে নষ্ট করে একইভাবে তা জামাআতে অন্যের নামাযের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে।

কুরআনে মুমিনদের নামায সম্পর্কে বলা হয়েছে, “মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়ী।” [সূরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২]

৩. ইমামের আগে যাওয়া

জামাআতে নামাযের সময় ইমামের আগে আগে মুসল্লীর রুকু-সেজদায় যাওয়া ও রুকু-সেজদা থেকে ওঠা আরেকটি সাধারণ ভুল। অনেক মুসল্লীই এমনটা করে থাকেন। অথচ হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, নিশ্চয় ইমাম রয়েছেন যেনো তাঁকে অনুসরণ করা। অতএব, ইমাম যখন তকাবীর বলে, তোমরাও তাকবীর বলো। তার তাকবীর বলার আগে তোমরা তাকবীর বলবে না। যখন ইমাম রুকু করে, তোমরাও রুকু করো। তার রুকু করার আগে তোমরা রুকু করবে না।… যখন ইমাম সেজদা করে তোমরাও সেজদা করো। তার সেজদা করার আগে তোমরা সেজদা করবে না…। [আবু দাউদ, হাদীস নং: ৬০৯]

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত ওপর হাদীসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন,

“যে ব্যক্তি ইমামের আগে তার মাথা তোলে তার কি এই ভয় নেই যে আল্লাহ তার মাথাকে গাধার মাথায় পরিবর্তন করে দিতে পারেন বা তার শরীরকে গাধার শরীরে পরিণত করে দিতে পারেন?” [বুখারী, হাদীস নং: ৬৯১; মুসলিম, হাদীস নং: ৪২৭]

৪. সেজদায় ভুল

সেজদার সময় রাসূল (সা.) স্পষ্টভাবে শরীরের সাতটি অংশ ভূমির সাথে স্পর্শ করিয়ে সেজদা করার নির্দেশ দিয়েছেন; নাকসহ কপাল, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পা। অনেকেরই সেজদার সময় এগুলোর কোন কোনটি ভূমি স্পর্শ করে না। ফলে তাদের সেজদা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সাতটি অঙ্গের মাধ্যমে সেজদা করতে যেমন নাকের অগ্রভাগসহ কপাল, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।” [বুখারী, হাদীস নং: ৮১২; মুসলিম, হাদীস নং: ৪০৯]

৫. সেজদার সময় হাত ভূমির উপর বিছিয়ে দেওয়া

এই ভুলটা অনেক বেশি হয়। সেজদার সময় হাতকে কনুই পর্যন্ত ভূমির উপর পুরোপুরি বিছিয়ে দেয়। কিন্তু রাসূল (সা.) কঠোর ভাষায় এ থেকে নিষেধ করেছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “সেজদার সময় তোমাদের বাহুকে ভূমির উপর কুকুরের মত বিছিয়ে দিয়োনা।” [মুসলিম, হাদীস নং: ৯৯৭]

৬. সতর ঢাকা না থাকা

নামাযের সময় অনেকেরই সতর অনাবৃত হয়ে পড়ে। বিশেষত টাইট প্যান্ট এর সঙ্গে শর্ট শার্ট ও টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায় সেজদা করার সময়। কিন্তু নামাযের প্রধানতম একটি শর্ত হলো সতর ঢাকা। সুতরাং এই বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

৭. তাকবির না দেওয়া

অনেক সময় জামাআতে নামায শুরু হয়ে গেলে অনেক মুসল্লীই ইমাম নামাযের যে পর্যায়ে থাকেন, সেখান থেকেই ইমামকে অনুসরণ করা শুরু করেন। তারা নামায শুরুর জন্য তাকবীরে তাহরীমা করতে ভুলে যান। কিন্তু নামাযের ফরযগুলোর প্রথমটিই হলো তাকবীরে তাহরীমা। এটি ছেড়ে দিলে নামাযই হবে না।

ইমাম নামায শুরু করার কিছু সময় পর যদি মুসল্লী তার সাথে নামাযে যোগ দেন অথবা ইমামের রুকু-সিজদার পর যদি মুসল্লী তার সাথে নামাযে যোগ দেন, তবে তাকে প্রথমে তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে নামাযে প্রবেশ করে ইমামের সাথে নামায আদায় করতে হবে।

৮. নামাযে দৃষ্টি ঠিক না রাখা

নামাযে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ আশপাশে দৃষ্টিপাত করতে থাকেন। এ ধরণের আচরণ থেকে রাসূল (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করে এই আচরণ থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “কি করে কিছু ব্যক্তি নামায আদায়ের সময় তাদের চোখকে আকাশের দিকে তুলতে পারে? নামাযের সময় লোকদের আকাশের দিকে চোখ তোলা থেকে বিরত থাকা উচিত, অন্যথায় তাদের দৃষ্টিকে কেড়ে নেওয়া হতে পারে।” [বুখারী, হাদীস নং: ৭৫০]