রায়ে যে ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি দিলেন বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী

81
Print Friendly, PDF & Email

ঋত্বিক তারিক, ঢাকা:

ব্যাপক আলোড়ন সুষ্টিকারী পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ দমন ও হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় বিষয়ে হাইকোর্টের বৃহত্তর বিশেষ বেঞ্চের বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তাঁর সুদীর্ঘ রায়ে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব  উল্লেখ করে দিয়েছেন নানা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকীর সম্পাদিত যুগান্তকা এ রায় বিশ্বের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ হিসেবে ইতোমধ্যেই একটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
বিচারপতি সিদ্দিকীর বাংলায় লেখা ১৬ হাজার ৫৫২ পাতার রায়ে মামলার প্রেক্ষাপট, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও নৃশংসতার সচিত্র পর্যবেক্ষণ, প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক আইনের প্রয়োগ এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের সঙ্গে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার একমত পোষণ করেছেন।

জনস্বার্থ বিবেচনা করে বিচারপতি সিদ্দিকী প্রদত্ত রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণ জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা নিউজবিটোয়েন্টিফোর ডটকম এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো তৃতীয় কিস্তি।

রায়ের সুচনালগ্নে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষনে নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনার উদ্ভুদ পেশাদারী অপরাধ জগতের সর্ববৃহ এই মামলায় সর্বাধিক সংখ্যক অভিযুক্তের মৃত্যুদন্ড অনুমোদন, যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ বিভিন্ন প্রদত্ত সাজা বহালের যথার্থতা নিরুপনে আদালতের প্রাসঙ্গিক নজির গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়েছেন। পাশাপাশি মামলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড ও আমেরিকাসহ পৃথিবীর বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে ন্যায়বিচার, অপরাধের সাজা এবং আইনের শাসন সম্পর্কে সংবিধানের মূলদর্শন, বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ ২৭, ৩১, ৩২, ১০৬ ও ১১১ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা আলোচনা করেছেন।

পিলখানা হত্যা মামলায় মুত্যুদন্ড অনুমোদনের রায়ে বিচারপতি সিদ্দিকী তাঁর পর্যবেক্ষনে দার্শনিক, আইন বিজ্ঞানী, সমাজ বিজ্ঞানী, অপরাধ বিজ্ঞানী, দন্ড বিজ্ঞানী, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগনের গবেষনায় অপরাধী, অপরাধের ধরন ও কারন এবং প্রতিকার সম্পর্কে প্রদত্ত মতবাদ বিশ্লেষণ করেছেন। মামলাটির বিশালতা বিবেচনায় অপরাধ ও ফৌজদারী আইনের সৃষ্টিলগ্ন থেকে ন্যায় বিচার সংক্রান্ত খ্যাতিমান মনিষীগনের সুচিন্তিত মতবাদ বিবেচনায় নিয়েছে। রায়ে সুবিশাল পর্যবেক্ষনে হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধের সাজা প্রদান সংক্রান্ত পবিত্র কোরআন, বাইবেল, গীতাসহ বিভিন্ন ধর্মে উল্লেখিত নির্দেশনা আলোচনা করেছেন। তিনি ১২১৫ সালের কিং জনের বিখ্যাত ম্যাগনাকার্টা, ১৬৮৯ সালের পিটিশন অব রাইটস, ১৮৭৯ সালে আমেরিকার সংবিধানে ঐতিহাসিক পঞ্চম সংশোধনীতে সংযোজিত বিলঅব রাইটস, ভারতের পাঞ্চাব রাজ্যের জালিয়ান ওয়ালা বাগের নির্মম হত্যাকান্ড, ড. ইয়ং এর আইডিয়া অব পানিসমেন্ট, আইনের শাসন ও ন্যায় বিচারের জন্যে প্রতিষ্ঠিত নীতি, ফৌজদারী অপরাধ জগতের ইতিহাসে সুবিশাল এই মামলায় সংঘটিত অপরাধ, সংঘটনের স্থান, অপরাধের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়, ষড়যন্ত্র অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, নৃসংশ হত্যাকান্ডসহ নানাবিধ অপরাধ কর্ম, অপরাধীর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়, নিহত ও ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি ঘটনার প্রভাব, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নবগঠিত সরকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেল, ঘটনার পারিপার্শিকতা বিবেচনায় দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোয় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে উল্লেখিত বিষয়ে প্রদত্ত দিকনির্দেশনার আলোকে তর্কিত রায়ে দন্ড ও সাজাপ্রাপ্তদের খালাস ও শাস্তি বহালের ক্ষেত্রে আইনানুগ যৌক্তিকতা তাঁর রায়ে বিবেচিত হয়েছে।

মাতৃভাষায় লেখা রায়ের পর্যবেক্ষনে দেশের প্রচলিত ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক আইনের পাশাপাশি এই উপমহাদেশের উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তিকৃত Landmark judgment হিসাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে হত্যা মামলা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দীরা গান্ধী হত্যা মামলা, ভারতের অপর প্রধানমন্ত্রী শ্রীমান রাজীব গান্ধী হত্যা মামলা, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টোর মামলাসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক মামলার নির্দেশনা এই রায়ে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা এবং অনুস্বরন করা হয়েছে।

হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ বেঞ্চের বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর পিলখানা হত্যা মামলার রায় দিয়েছিলেন। ৮ জানুয়ারি, বুধবার ৭৭৪ দিনের মাথায় বিডিআর হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যে ১৬ হাজার ৫৫২ পাতার রায় লিখেছেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী।

বিচারপতি সিদ্দিকী বাংলাদেশ রাইফেলসের বর্নাঢ্য ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধে বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষনে বলেছেন, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া স্বাধীনতার দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষনে এদেশের কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতার সাথে সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর বাঙ্গালী সৈনিকরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনটি ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংগঠন UNESCO কর্তৃক বিশ্বের ঐতিহাসিক এক অনন্য দলিল হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ৭ই মার্চের ভাষন সমগ্র বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরনার উৎস হয়ে থাকবে।

১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করলে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ (ইপিআর) এর মেধাবী বাঙ্গালী সৈনিকরা অত্যান্ত দক্ষতার সাথে ওয়ারলেসযোগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার বার্তা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। যার ফলে ইয়াহিয়া খানের পাক হানাদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে এদেশের ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং শুরু হয় বাঙালী জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। উল্লেখ্য যে, ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা ওয়ালেসে প্রচার করায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে ইপিআরের সুবেদার মেজর শওকত আলীসহ ৪ জন বীর সৈনিক নিহত হয়। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনা শোনা মাত্রই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রাতের অন্ধকারে দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাজোয়া যানগুলো বেরিয়ে প্রতিটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তাদের দখলে নিয়ে দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা তৈরী করে।

প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর তাৎক্ষনিকভাবে কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা সেক্টরের ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) কমান্ডিং অফিসার মেজর আবু ওসমান চৌধুরী বাঙ্গালী সৈনিকদের নিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর ও পোড়াদহসহ চারদিকে অবস্থান গ্রহণ করে। স্থানীয় ছাত্র-জনতা দেশীয় অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে ইপিআর বাহিনীর সাথে একসঙ্গে পাকিস্তানী সেনাদের প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ৩০ ও ৩১ মার্চ ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে মাত্র ০৭ (সাত) দিনের মধ্যে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ১ এপ্রিল সর্বপ্রথম কুষ্টিয়া জেলাকে শত্রুমুক্ত করে। ওইযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর অফিসার ও সৈনিকসহ ২১৬ জন সকলেই নিহত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বপ্রথম এই বিজয় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। (চলবে)