‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ উদ্‌ঘাটনে তদন্ত কমিশন গঠনে বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী সুপারিশ

67
Print Friendly, PDF & Email

ঋত্বিক তারিক, ঢাকা:
পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ দমন ও হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় বিষয়ে হাইকোর্টের অন্যতম রায়দানকারী বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তাঁর দীর্ঘ রায়ে ‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ উদ্‌ঘাটনে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছেন।

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকীর লেখা যুগান্তকারী এই রায়ের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ রাইফেলসের ২১৮ বছরের বর্ণাঢ্য ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর অবদান, সেনা অফিসারদের নেতৃত্বের প্রতি বাহিনীর অসন্তোষ, বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট, ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, ঘটনার নৃশংসতা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি বিদ্রোহীদের প্রকাশ্য হুমকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা, বিদ্রোহের লক্ষ্য, ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৪৮ দিনের নবগঠিত সরকারের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ, বিদ্রোহের পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ঘটনার পেছনের ঘটনা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নজিরবিহীন মামলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা নিয়ে তিনি গবেষণামূলক সুদীর্ঘ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছেন।

বহুলালোচিত পিলখানা হত্যা মামলায় বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকীর সম্পাদিত রায়টি বিশ্বের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ হিসেবে একটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। তাই জনস্বার্থ বিবেচনা করে বিচারপতি সিদ্দিকীর রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণটি জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা নিউজবিটোয়েন্টিফোর ডটকম এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় কিস্তি।

রায়ের উপসংহারে বলা হয়, অত্র রায়ে ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক আইনের ব্যাখ্যা, পর্যালোচনাসহ ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও খালাসপ্রাপ্ত সব আপিলকারীর মামলা পৃথক পৃথক পর্যবেক্ষণে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

বাংলায় লেখা ১৬ হাজার ৫৫২ পাতার রায়ে মামলার প্রেক্ষাপট, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও নৃশংসতার সচিত্র পর্যবেক্ষণ, প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক আইনের প্রয়োগ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের রায়ের শুরুতে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, ‘This is undoubtedly an unprecedented and historic case. Seldom, if ever, has a criminal case involved such a large number of accused persons, with including all the documents running into huge number of pages.
The Death References relate to the horrific, barbaric and tragic incident that took place on 25 & 26 February, 2009 at Peelkhana, the headquarter of the then Bangladesh Rifles (BDR), located in the heart of the Capital City Dhaka, resulting in the death of 74 persons, including the Director General of Bangladesh Rifles together with 56 other brilliant officers of different ranks of Bangladesh Army.
Although the Special Bench is unanimous with regard to the final verdict in respect of the order of conviction and sentences, yet each of the members of the Bench have decided to express their views and reasons separately. Accordingly, I intend to pronounce the following judgment expressing my own observations and views with reasoning. Being conscious of the magnitude of the case as well as the gravity of the offences committed, I feel constrained to make certain observations at the outset.

The incident in question, the Peelkhana Tragedy, as I may refer to it, is a barbaric, brutal and violent incident. In order to decide the legality and validity of the impugned judgment and order of conviction and sentence dated 05.11.2013, I have adhered to the legal and penal provisions of the laws of Bangladesh, I have also examined and considered various other aspects namely, jurisprudence, criminology, medical jurisprudence, sociology, penology, judicial pronouncements of our Supreme Court and other countries including UK, USA, India & Pakistan. I have also examined various chapters of the New Encyclopedia of Social Science. Last, but not least, I have also considered the religious dictates of Sharia Law along with other religious books like the Holy Quran, Geeta, Bible etc. I have also taken into account the provisions of the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, particularly the preamble of the Constitution as well as Articles 27, 31, 32, 106 & 111 thereof. The result of the extensive research undertaken by me has been reflected in my views expressed in the body of this judgment.
Considering the legal and social implications and to ensure proper understanding with regard to the issues of dispensation of justice, keeping in view the individual identity and the social standings of the victims as well as those of the convict appellants and their respective families, I propose to deliver my judgment together with my observations in our mother-tongue-‘Bangla’.’

মামলার বিশালতা, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বিশেষ করে দণ্ড ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহজে বোঝার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী রায়টি বাংলায় লিখেছেন।

ঐতিহ্য ও বীরত্বগাথা:
আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘২১৮ বছরের অধিককালের ঐতিহ্যবাহী আধা সামরিক বাহিনী হিসেবে বিডিআরের নেতৃত্ব শুরু থেকেই সেনাবাহিনীর হাতে ছিল। ফলে সাধারণ জওয়ান ও সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ক্রমান্বয়ে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ফলে বিডিআর সদস্যদের মধ্যে সেনা অফিসারদের কর্তৃত্ব মেনে না নেওয়ার এক প্রচ্ছন্ন মানসিকতা নীরবে সক্রিয় ছিল। উপরন্তু ওই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতায় পুষ্ট হয়ে বাংলাদেশ রাইফেলসের বিভাগীয় কতিপয় উচ্চাভিলাষী সদস্য ও একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনা ও উসকানিতে সাধারণ ও নবাগত সৈনিকগণ প্ররোচিত ও বিভ্রান্ত হয়ে একই উদ্দেশ্যে বিদ্রোহে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে তারা হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ও পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে।’

বাংলাদেশ বিলুপ্ত বাংলাদেশ রাইফেলসের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস উল্লেখ করে রায়ে বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকীর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে সামান্য সংখ্যক প্রাচীন অস্ত্র নিয়ে তৎকালীন ইপিআর বাহিনী এক অসামান্য ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। আধা সামরিক বাহিনী হয়ে ইপিআরের বীর সৈনিকবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব ও সুমহান আত্মত্যাগের ইতিহাস রচনা করে জাতিকে গৌরবান্বিত করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ইপিআরের সাড়ে ১২ হাজার বাঙালি সৈনিক সরাসরি অংশগ্রহণ করে, অপরিসীম বীরত্বের জন্য শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব “বীরশ্রেষ্ঠ” পদক প্রদান করা হয়। এ ছাড়া এ বাহিনীর ৮ জন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম ও ৭৮ জন বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ৮১৭ জন বাঙালি সৈনিক (বীর মুক্তিযোদ্ধা) শহীদ হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ইপিআর বাহিনীর বাঙালি সৈনিকদের অপরিসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল, দেশপ্রেম ও চরম আত্মত্যাগ বাঙালি জাতি তথা সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। দেশমাতৃকার সেবায় পরিবর্তিত বিজিবির সৈনিকেরা ভবিষ্যতেও থাকবে নিবেদিতপ্রাণ, সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী, জাতি এটাই প্রত্যাশা করে।’

রায়ে পিলখানা বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী ডিএডি তৌহিদ সম্পর্কে বলা হয়, ‘তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্রপ্রহরী সশস্ত্র বাহিনীর ৫৭ জন মেধাবী অফিসারসহ ৭৪ জন নিরস্ত্র ব্যক্তিকে নির্মম ও বর্বরোচিতভাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকা প্রমাণিত হলে দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তি হবে, এটাই আইনের বিধান, কারণ কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’

বিচারপতি সিদ্দিকীর পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাবসহ সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে শ্বাসরুদ্ধকর ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।

বিদ্রোহীদের আট মূল লক্ষ্য:
বিচারপতি বিদ্রোহীদের আটটি মূল লক্ষ্য ছিল বলে উল্লেখ করেন। ১. সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করে যেকোনো মূল্যে দাবি আদায় করা, ২. বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ধ্বংস করে এই সুশৃঙ্খল বাহিনীকে অকার্যকর করা। ৩. প্রয়োজনে সেনা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর অফিসারদের বিডিআরে প্রেষণে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করা, ৪. বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করা। ৫. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪৮ দিনের নবনির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের প্রয়াসে অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশকে নিপতিত করা, ৬. বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করা এবং ৮. জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বিডিআরের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় দেশের অন্যান্য বাহিনীর অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত করা ইত্যাদি। (চলবে)