পিলখানা হত্যা মামলার রায়ে হাইকোর্টের যে ১১ দফা সুপারিশ

45
Print Friendly, PDF & Email

ঋত্বিক তারিক, ঢাকা:
আজ বুধবার প্রকাশিত পিলখানা হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ১১ দফা সুপারিশ করেছেন হাইকোর্ট। বুধবার (৮ জানুয়ারি, ২০২০) বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চে এই রায় প্রকাশ হয়।

এরমধ্যে বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই প্রথম মাতৃভাষায় লেখা ১৬ হাজার ৫ শ’ ৫২ পৃষ্ঠার রায়ে মামলার প্রেক্ষাপট, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও নৃশংসতার স্বচিত্র পর্যবেক্ষণ, প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক আইনের এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের সাথে অপর বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার একমত পোষণ করেছেন। উল্লেখ্য, বিচারপতি সিদ্দিকীর লেখা ২৭ লাখ ৯০ হাজার ৪শ’ ৬৮টি শব্দের এই রায়টি বিশ্বের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ রায় হিসেবে ইতোমধ্যেই নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।

বিচারপতি মো. শওকত হোসেন ১ থেকে ১১ হাজার ৪০৭ পৃষ্ঠা, মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ১১ হাজার ৪০৮ থেকে ২৭ হাজার ৯৫৯ পৃষ্ঠা ও মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ২৭ হাজার ৯৬০ থেকে ২৯ হাজার ২৯ পৃষ্ঠার এ রায় লিখেছেন।

প্রসঙ্গত; বহুলালোচিত পিলখানা হত্যা মামলার রায়টি ১৬ হাজার ৫ শ’ ৫২ পৃষ্ঠায় মাতৃভাষায় লিখে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকীর রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণটি আগামীকাল থেকে জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা নিউজবিটোয়েন্টিফোর ডটকম এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।

বুধবার (৮ জানুয়ারি, ২০২০) প্রকাশিত পিলখানা হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে যে ১১ দফা সুপারিশ করেছেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী সেই নির্দেশনাগুলো হলো:
১. (ক) বাংলাদেশ রাইফেলসের নিরাপত্তা বিষয়ক ইউনিট (আরএসইউ) বিজিবির মেধাবী, সৎ ও চৌকস সদস্যের সমন্বয়ে নুতন ভাবে ঢেলে সাজানো এবং পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে দায়িত্বে অবহেলার জন্যে ঘটনাকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা আরএসইউর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

(খ) ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে বাংলাদেশ রাইফেলসের মহাপরিচালকের দরবারে সশস্ত্র আক্রমণ এবং পিলখানায় মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পূর্বাভাস সংগ্রহে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার জন্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাসহ দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

২. (ক) গোয়েন্দা বাহিনী ও নিরাপত্তা কর্মীদের বাহ্যিক তৎপরতা দৃশ্যমান হলেও ভেতরে অন্তঃসারশূন্যতা পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অধিকতর সতর্ক করা।

(খ) বিডিআরে তীব্র অসন্তোষ এবং প্রকাশ্যে লিফলেট বিতরণ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাসহ কমান্ডিং অফিসারদের নজরে আসা সত্ত্বেও তারা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগ গ্রহণ না করে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্টদের জন্য মনোযোগী ও সতর্ক হওয়া।

৩. (ক) মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মেধাবী, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন দক্ষ, তড়িৎ ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারদর্শী, উপযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে বিজিবির মহাপরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

(খ) বিজিবির অফিসারসহ সকল পদের সদস্যদের মানবিক গুণাবলী, দায়িত্ব, কর্তব্য, বিভাগীয় আইন ও শৃঙ্খলা সম্পর্কিত প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণ।

৪. (ক) সামরিক/বেসামরিক সকল শ্রেণির কর্মকর্তাদের বৃটিশ আমলের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব পরিহার করে সকলকে সেবার মানসিকতা নিয়ে দেশপ্রেমের সাথে কাজ করার প্রশিক্ষণ প্রদান করা।

(খ) ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়া এবং বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সংগ্রামে পেশা, পদবি, সামাজিক পরিচয়কে প্রাধান্য না দিয়ে সংবিধানে উল্লেখিত মূলনীতি অনুসরণ করে সকলের প্রতি মানবিক আচরণ ও সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতায় বাহিনীকে গড়ে তোলা।

৫. (ক) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিজিবিসহ অধীস্থ সকল বাহিনীর সদস্যদের সুবিধা/অসুবিধা সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় আন্তরিকতা ও বিচক্ষণতার সাথে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

(খ) বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টির পূর্বেই কর্তৃপক্ষকে আইন সম্মত ও সম্মানজনক উপায়ে তার সমাধান খুঁজে বের করা।

৬. (ক) বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে চাকরি বিধি মতে মর্যাদার পার্থক্য যতদূর সম্ভব কমিয়ে আনা এবং সকলকে সংবিধান সম্মত উপায়ে আইনানুগ ভাবে সম্মানের সাথে প্রজাতন্ত্রের চাকরি করার সুযোগ সৃষ্টি করা।

(খ) বিজিবির সদস্যদের পদোন্নতি, বেতন, ভাতা, রেশন, ছুটি, আবাসিক সমস্যা, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণের সুবিধাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত সমাধানে মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৭. (ক) আইনানুগ কোনো বাধা না থাকলে অন্যান্য বাহিনীর ন্যায় বিজিবির সদস্যদের জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

(খ) বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের প্রতি সম-আচরণ করা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডিং অফিসার কর্তৃক অধীনস্তদের প্রতি আত্মমর্যাদা হানিকর যে কোন আচরণ থেকে বিরত থাকা, কারণ তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।

৮. (ক) ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে পিলখানায় নিহত সামরিক, আধা-সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।

(খ) সেনা কর্মকর্তাসহ নিহতদের সন্তান বা পরিবারের উপযুক্ত সদস্যদের আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তা বিধানে যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

(গ) সামরিক কর্মকর্তাসহ নিহতদের সম্মানে পিলখানাসহ দেশের সকল সেনানিবাস, বিজিবির সকল সেক্টর হেড কোয়ার্টারে নাম ফলক নির্মাণ করা।

৯. (ক) পুনর্গঠিত বিজিবি সংবিধান ও নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে দেশের সীমান্ত রক্ষাসহ তাদের উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব পেশাদার বাহিনী হিসেবে দেশ-প্রেম, সততা ও শৃঙ্খলার সাথে পালনের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বিজিবির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা।

(খ) দেশের সীমান্তরক্ষী হিসেবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রাথমিক নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বে থাকা বিজিবিকে শক্তিশালী বাহিনী রূপে গড়ে তোলার কার্যকরী পদক্ষপ গ্রহণ করা।

১০. (ক) সেনা বাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীকে ‘অপারেশন ডাল ভাতের ন্যায়’ অন্য কোনো আর্থিক কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত পরিহার করা। আর্থিক লেনদেন ও লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যে অহেতুক বিভেদ ও নৈতিক স্খলনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ রাইফেলসের ক্ষেত্রে ‘অপারেশন ডালভাত’ উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

(খ) পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ‘ঘটনার পিছনের ঘটনা’ উদঘাটন করে জাতির সামনে প্রকৃত স্বার্থান্বেষী মহলের চেহারা উন্মোচনের জন্যে জনস্বার্থে সরকার প্রয়োজন মনে করলে আইনানুগভাবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারা তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

১১. (ক) সমাজের সকল স্তরে নৈতিকতা পুনরুদ্ধার ও জাতিগঠনের জন্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষায় বাধ্যতামূলক নীতিশাস্ত্র (এথিকস) শিক্ষাদান অতি জরুরি। নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সমাজের প্রতিটি স্তরে অসম প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নীতিশাস্ত্রের অধ্যায়ন বাধ্যতামূলক হওয়া অপরিহার্য।

(খ) রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বসবাস উপযোগী উন্নত ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে নিজ নিজ ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুশাসনে শিশুদের চরিত্র গঠনের মাধ্যমে মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার বিশুদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি।