সোলাইমানি হত্যায় বাংলাদেশে তিন ধরণের প্রভাব পড়তে পারে

37
Print Friendly, PDF & Email

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুক্রবার (০৩ জানুয়ারি) সকালের এ হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে তা নিয়েই শঙ্কায় বিশ্লেষকরা। উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতির আঁচ লাগতে পারে বাংলাদেশেও। এমনটাই মনে করছেন তারা।

সোলাইমানিকে হত্যার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের নাগরিকদের ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারে সব ধরনের মার্কিন বিমানকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, সোলাইমানি হত্যার পর একদিন পার না হতেই ইরাকে দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলাও যুক্তরাষ্ট্র চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। যদিও পরের হামলাগুলোর কথা অস্বীকার করেছে মার্কিন প্রশাসন। অন্যদিকে, ইরাকে নতুন করে ৩ হাজার সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। যা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এদিকে, ইরানের পক্ষ থেকেও একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি এই হামলার কঠোর প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা করেছেন। জাতিসংঘে ইরানি রাষ্ট্রদূতও হামলার জবাব হামলা দিয়েই দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। শনিবার ইরানের বিমান বাহিনী মহড়া চালিয়েছে। ইরান সমর্থিত হামাস, হিজবুল্লাহসহ ইরনাপন্থী অন্যান্য ইসলামিক প্রতিরোধ যোদ্ধারা সোলাইমানি হত্যার বদলা নেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, চলতি বছরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের আগে মার্কিনীদের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করে নির্বাচনী খেলায় জেতা ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে লাভবান হবেন ট্রাম্প। ফলে নির্বাচনের আগে ইরানের সাথে একটি সম্মুখ সমর শুরু করা তার জন্য জরুরী।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয় তাহলে তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান।

বাংলাদেশে কী ধরণের প্রভাব পড়তে পারে? জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিরাজ করলে শঙ্কার কিছু নেই। কিন্তু পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি ঘটে তাহলে বাংলাদেশে তিন ধরণের প্রভাব পড়বে।

প্রথমত: তেলের দাম
সংঘাত শুরু হলে ইরান প্রথমে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। এর প্রভাব পড়বে দুনিয়াজুড়ে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করে। তেল সরবরাহ বিঘ্ন হলে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাবে। বাংলাদেশকেও অতিরিক্ত দামে তেল কিনতে হবে। এর ফলে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। জ্বালানির দাম বাড়লে নানা খাতেই তার প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয়ত: রেমিটেন্স
অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্য হচ্ছে রেমিটেন্সের প্রধান উৎস। এখানে যদি সংঘাত হয় তাহলে রেমিটেন্সে প্রভাব তো পড়বেই। কারণ মধ্যপ্রাচ্য এখন দুই ব্লকে বিভক্ত। ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ব্লকে রয়েছে সৌদি, আরব আমিরাত, কুয়েতসহ কয়েকটি দেশ। কিন্তু এই তিনটি দেশে লাখ লাখ প্রবাসী রয়েছে। অন্যদিকে, ইরান ব্লকে রয়েছে কাতারসহ কয়েকটি দেশ। কাতার বাংলাদেশের রেমিটেন্সের বিরাট উৎস। এসব দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ সরাসরি ভুক্তভোগী হবে।

তৃতীয়: কূটনৈতিক
তৃতীয় দিকটি হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ। ইরান ও কাতার চীন-রাশিয়া ব্লকের সঙ্গে আছে। চীন-রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশেরও ভালো বন্ধুত্ব রয়েছে।

অন্যদিকে, সৌদি, কুয়েত ও আরব আমিরাত ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ব্লকে। বাংলাদেশ এই দুই ব্লকের কোনো ব্লকেই যেতে পারবে না। ফলে একটা উভয় সঙ্কটে পড়তে হবে। তবে বাংলাদেশের কোনো পক্ষেই যাওয়া উচিৎ হবে না বলে মত দেন ড. তারেক শামসুর রেহমান।