আ.লীগের মনোনয়ন: হেভিয়েটের আধিক্যে দক্ষিণই ছড়াচ্ছে সিটি নির্বাচনে উত্তাপ

24
Print Friendly, PDF & Email

ঋত্বিক তারিক, ঢাকা:
বর্তমান সময়ে রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জায়গা দখল করে নিয়েছে আগামী ৩০ জানুয়ারির আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও ‘কে হচ্ছেন মেয়রপ্রার্থী’ এ নিয়ে আলোচনা এখন বেশ জমে উঠেছে। নেতাকর্মীরা নানা সমীকরণ আর যুক্তিতে খোঁজার চেষ্টা করছেন- কে হাসবেন শেষ হাসি। বিষয়টির সুরাহা আর একদিন পর শনিবার সন্ধ্যায় দলের স্থানীয় বোর্ডের বৈঠকে হতে যাচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিশেষ কোনো চমক নেই। উত্তরে বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন বলেই দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে- তা নিয়েই উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতির অঙ্গনে। দলীয় সূত্র বলছে, বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনেই আস্থা রাখতে চাইছে আওয়ামী লীগ। তবে দক্ষিণে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ঢাকা-১০ আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের মতো হেভিওয়েট নেতারা। সেক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পাল্টে চমকও আসতে পারে বলেই ধারণা করছেন অনেকে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তরের প্রার্থী অনেকটা চূড়ান্ত হলেও দক্ষিণের প্রার্থী চূড়ান্ত করা নিয়ে উত্তাপের পারদ বাড়ছে দলীয় রাজনীতিতে। ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে লড়তে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এবং হাজী মোহাম্মদ সেলিম দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার পরই এ রাজনীতি জমে ওঠে। তবে শুক্রবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুরে আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু মনোনয়ন পত্র কেনার পর উত্তাপের পারদ চূড়ান্তে গিয়ে পৌঁছেছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরু বলেন, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আমি আশাবাদী। বর্তমান সমাজ, রাষ্ট্র যেভাবে ডিমান্ড করছে তাতে আমি নিজেকে এই পদের জন্য উপযুক্ত প্রার্থীদের একজন বলে নিজেকে মনে করি। তবে দল যাকেই মনোনয়ন দেবে তা মেনে নিয়ে তার জন্য কাজ করব।

দলীয় একটি সূত্রমতে, বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) রাতে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে নির্বাচনের মাঠ গোছাতে বলেছেন বলে কয়েকটি সূত্রে দাবি করা হয়। ওই সূত্রের মতে সাঈদ খোকনের এবারও মেয়র প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নব্বই ভাগ। এর আগে ওই দিন দুপুরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ডিএসসিসির মেয়রপ্রার্থী হিসেবে নৌকার মনোনয়ন ফরম কেনার পর সাঈদ খোকন অশ্রুসজল চোখে ঢাকাসহ দেশবাসীর দোয়া চেয়ে রাজনীতিতে কঠিন সময় পার করছেন বলে জানান।

তবে দলীয় আরেকটি সূত্র বলছে, এবার সাঈদ খোকনের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ তিনি ডেঙ্গু ইস্যুসহ কয়েকটি কারণে ঢাকাবাসীর বিরাগভাজন হয়ে রয়েছেন এরইমধ্যে। সম্প্রতি ডেঙ্গু পরিস্থিতি তার অবস্থান আরো নড়বড়ে বানিয়ে দিয়েছে। এ কারণে তাকে মনোনয়ন দিয়ে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দলটি ক্ষতির সম্মুখীন হতে চাইবে না।

এদিকে, আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের পক্ষে দলের একটি অংশ অবস্থানও নিয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও দলের আরেকটি অংশ মনে করে, ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে সাঈদ খোকনকে আরেকবার রাখা হোক।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে দলীয় মনোনয়নের নির্ণায়কের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শুক্রবার বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো পদেই কাউকে নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি। বিতর্কিত কাউকেই সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বিতর্কিত আমরা এমন কাউকে মনোনয়ন দেব না। বিতর্কের ঊর্ধ্বে যারা আছে, অপকর্মের রেকর্ড নেই, তাদের আমরা চয়েস করব। একসেপটেবল অ‌্যান্ড পপুলার ক্যান্ডিডেট অর্থাৎ জনগণের কাছে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য- এ ধরনের প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার জন্য আমাদের বোর্ড বসবে। সর্বাত্মকভাবে আমাদের নেত্রীরও মাউন্ড সেট- ক্লিন ইমেজের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া।’

দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকা উত্তরে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর উপ-নির্বাচনে জয়ী হওয়া বর্তমান মেয়র আতিকুল হক নিজেকে প্রমাণ করার খুব একটা সময় পাননি। মাত্র ১০ মাসে তার কাজের মূল্যায়ন করাও কঠিন বলে মনে করছেন দলের নেতারা। তবুও এই অল্প সময়ে কাজ করার ইচ্ছাশক্তি আর মানসিকতা তাকে এগিয়ে রাখছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু নিয়ে যখন টালমাটাল দুই সিটি করপোরেশন, তখন তার তড়িৎ পদক্ষেপ নেয়ার মানসিকতা প্রশংসিত হয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনায় তিনিই আবারো উত্তর সিটি করপোরেশনে নৌকা হাতেই মাঠে নামছেন।

দলীয় একটি সূত্র বলছে, তাপস দলকে না জানিয়েই মনোনয়ন কিনেছেন। তবে কোনো সিগনাল ছাড়া দলীয় ফরম নিয়েছেন- এমনটি মনে করেন না আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। তাদের মধ্যে দুজনের মতে, তাপস শেখ পরিবারের আত্মীয়। তিনি এমনিতেই ফরম কিনবেন না। নিশ্চয়ই কোনো ইঙ্গিত রয়েছে। তাপসের মনোনয়ন পাওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে বলেও তারা মনে করেন। অন্যদিকে, দলের আইন বিষয়ক সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরুর মনোনয়ন ফরম কেনার বিষয়ে তারা ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তারা এ-ও মনে করেন, এই দুজন হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়ন ফরম কেনা ভিন্ন ইঙ্গিত বহন করে।

তাপসের ঘনিষ্ঠ একজন জানান, মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী তিনি। তিনি তো দলীয় সিগন্যাল ছাড়া মনোনয়ন ফরম কেনেননি। নির্বাচিত হলে তিনি নগরকে কীভাবে উন্নয়ন করতে চান সেই বিষয়েও বিভিন্ন সময়ে বলে আসছেন।

নজিবুল্লাহ হিরুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজনও জানান, দলের শীর্ষ মহলের ইতিবাচক সমর্থন পেয়েই তিনি শেষ দিনে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন। মনোনয়ন ফরম কিনবেন কি না- সেজন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। গণভবন থেকে তিনি ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছেন। সার্বিক দিক বিবেচনায় তাপস আর হিরুই দক্ষিণে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

জানা গেছে, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা ঢাকা-১০ এর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপস ঢাকা উত্তর সিটির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সফলতার মডেল অনুসরণ করতে চান। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়ার কথাও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় গণভবনে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভা হবে জননেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে। সেখানে দুই সিটির মেয়র ও ১৭২ জন কাউন্সিলরকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।