“ক্রাইম পেট্রল” দেখে ৫ম শ্রেনীতে পড়ুয়া ছাত্রের হত্যার পরিকল্পনা!

32

নিউজবিটুয়েন্টিফোর অনলাইন রিপোর্টঃ
পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ুয়া দুই ছাত্রের “ক্রাইম পেট্রল” দেখে তার এক বন্ধু আরাফাত(১২)কে হত্যার পরিকল্পনা করে! ঘটনায় উপস্থিত ঈশ্বরদি থানার এস আই অসিত কুমার বসাকের একটি ফেসবুক গ্রুপের লেখা থেকে বিষয়টি প্রকাশ পায়।

এস আই অসিত কুমার বসাকের লেখনী থেকেঃ
রাত্রী ১০.৩০ ঘটিকা আমি বাসায় খেয়ে বাচ্চার সাথে খেলছি, হটাৎ ইন্সপেক্টর (তদন্ত) অরবিন্দ সরকারের ফোন, তুমি কোথায়? আমি বাসায় স্যার, তারাতারি রেডি হও, একটা ১৩ বছরের ছেলে মিসিং আজ দুপুর থেকে- ফোনের অপর প্রান্তে থেকে স্যার বললেন । আমি মনে মনে ভাবছি আগামীকাল বিজয় দিবস, ডিউটি আছে, এত রাতে আবার আমাকেই যেতে হবে ! যাইহোক যেতে তো হবেই । স্যার কে বললাম আমাকে যা্ওয়ার সময় যেন জরুরী গাড়িতে নিয়ে যায় । দশ মিনিট পর বাসায় সামনে পুলিশে গাড়ী এসে হাজির । আমি তারাতারি গাড়িতে উঠে মোবাইল স্ক্রীনে দেখি যে, সময় ১০.৪৫ মিনিট, ২২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা । গাড়িতে উঠে দেখি এসআই শরিফুল, তদন্ত স্যার এবং হারানো ছেলেটির বাবা আগে থেকে আলোচনা করছিল বিষয়টি নিয়ে । আমি তাদের কাছ থেকে সংক্ষেপে যা শুনলাম, নিখোজ ছেলেটির নাম মোঃ আরাফাত(১২) পিতা-আকমল সাং-গড়গড়ি থানা-ঈশ্বরদী জেলা-পাবনা গত ১৫/১২/১৬ তারিখ সকাল ০৮.০০ টায় বাড়ি থেকে নিখোজ হয় । তারপর বিভিন্ন বন্ধুদের সাথে খেলা শেষে দুপুরে বাড়ি ফিরে আসেনি । আরাফাত যেখানে খেলা করে সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত্রী ১১.১০ মিনিট, থানা থেকে প্রায় ১৮ কিমি দূরে। ডেকে আনা হল আরাফাতের কাছের বন্ধু বাব্বি(১৪)(৫ম শ্রেনি)কে । লোকজনের মাঝে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকি অবিরাম । রাব্বি জানায় দুপুর ১২.০০ টায় সে আরাফাতকে অচেনা ১২ বছরের একজন ছেলের সাইকেলে করে কোথায় যেন গিয়েছে । অপর একজনকে ডেকে আনা হলো যার নাম সিয়াম(১৫), সে সর্ব শেষ দেখেছে রাব্বি(১২)(ষষ্ঠ শ্রেনি), রাসেল(১৩) (৭ম শ্রেণি) এবং রাকিব(৭ম শ্রেণি)(১২)দের সাথে খেলা করতে । শুরু হলো রাসেল এবং রাকিবের খোজা । রাসেল এবং রাকিব খালাতো ভাই । তারা্ও একই কথা বলে যে আরাফাত অচেনা একজনের সাথে সাইকেলে করে কোথায় যেন চলে গিয়েছে । ধৈয্য ধরে পর্যায়ক্রমে আমি একবার জিজ্ঞাসাবাদ করি তো পরের বার তদন্ত স্যার । এভাবে জিজ্ঞাসাবাদ চলে প্রায় দেড় ঘন্টা । জিজ্ঞাসাবাদে পরের বার রাসেল আমাকে বলে স্যার আমার কিছু হবে না তো? আমি বলি আগে বলতে হবে কি হয়েছে। রাসেল বলে স্যার আরাফাতের লাশ কোথায় আছে আমি তা জানি কিন্তু স্যার আমি কাছে যেতে পারবোনা । আমি বলি আচ্ছা আগে লাশ দেখিয়ে দেও । আমি আরো পুলিশ অফিসার এবং ফোর্সের জন্য সামান্য অপেক্ষা করতে চাইলে অরবন্দি স্যার না করে বলে আরাফাত তো বেচেও থাকতে পারে । আমি বললাল ঠিক আছে । আমরা রাব্বি , রাসেল এবং রাকিবদের সংগে নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা করিলাম । রাব্বিকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকলে সেও অবশেষে স্বীকার করে যে, রাসেল আর রাকিব আরাফাতকে ডেকে নিয়ে মারছে আখের ক্ষেতের মধ্যে, সেও্ জায়গাটি চেনে । আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম রাব্বিকে দিয়ে জায়গাটি সনান্ত করবো । ভিকটিমের বাড়ি থেকে ঘটনাস্থল প্রায় ০১ কিমি. । রাস্তা থেকে নেমে আমরা চরের মধ্যে দিয়ে আবাদের জন্য তৈরী করা মাটির জমির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি তদন্ত স্যার, এসআই শরিফুল, আর আটককৃত রাব্বি । যতই যাচ্ছি ততই মাটি নরম হতে থাকে, পা যেন ডুবে যেতে চায় । রাত্রী ০১.৩০ তাপমাত্রা প্রায় ২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস, গা ছমছম করছে । তারপর আমরা একটা আমরা আম বাগানের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর আখের ক্ষেত খুজে বের করি । রাব্বি বলে স্যার এই আখের ক্ষেতের মধ্যে আরাফাতকে মেরে ফেলছি । সে এখানে মরে পরে আছে । আখের ক্ষেত এত ঘন যে, মনে হচ্ছে যে, এক একটা আখ গাছ এক একটা বাশ, একটা দা থাকলে সেগুলো কেটে ভিতরে ঢুকলে ভাল হতো । তারপর একটা একটা করে আমি আর তদন্ত স্যার আখ গাছ ভাংতে থাকি । আমি খুজতে থাকি লাশটা কোথায়? আমি তদন্ত স্যারকে বলি রাব্বিকে আখের ক্ষেতের মধ্যে আনতে হবে এবং সনাক্ত করে দিতে হবে এত বড় ক্ষেতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে টর্চলাইটের আলোতে লাশ পাওয়া খুব কঠিন । তারপর রাব্বি আখের ক্ষেতে ঢুকে দেখিয়ে দিতেই দেখি একটি ছেলে, লাল গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট পড়া উপর হয়ে পরে আছে । মাথায় অনেগুলো আঘাত, মাথায় মাংস গুলো বেড়িয়ে আসছে, বাম কান অধিকাংশ অংশ কাটা । রক্তে ভেসে যাচ্ছে, তদন্ত স্যার পালস দেখতে বললেন, আমি বডির আরো কাছে পালস দেখতে গিয়ে দেখি, পড়ে থাকা দেহ থেকে খুব আস্তে আব্বু আমাকে বাচাও শব্দ বের হচ্ছে । দীর্ঘ ১৩ ঘন্টা ধরে এত রক্ত ক্ষরনের পর এত ঠান্ডার মাঝে আরাফাত বেচে আছে আমার কেমন যেন অবাস্তব মনে হচ্ছে । আমি স্যারকে চিৎকার দিয়ে বললাম আরাফাত বেচে আছে । তারাতারি আরাফাতের বগলের নীচে হাত রেখে তাকে আখের ক্ষেত হইতে বের করে আনছিলাম আর আরাফাত অস্ফুট স্বরে বলছিল আপনারা কারা? আমাকে একটা বালিশ দিন আমি একটু ঘুমাবো । আমার আব্বু আম্মু কোথায়? আরাফাতের মাথায় বের হওয়া মাংসগুলো কুশালের ধারালো পাতা দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হচ্ছিল আর আরাফাত চিৎকার দিচ্ছিল । তদন্ত স্যার বলল আখের গাছগুলো ভেংগে ছোট রাস্তা বের করতে । আমি তাই করলাম । কোন মতে তাকে আখের ক্ষেত হতে বের করতে আমাদের তিনজনের জান বের হয়ে যাচ্ছিল । আমরা এই শীতে ঘেমে একাকার । আমাদের গায়ে রক্তের ছোপছোপ দাগ । আরাফাতের স্বাস্থ্য ভাল ওজনও বেশী । তাকে হাতের উপর করে কিছু দূর আনার পর এসআই শরীফুল বয়স্ক মানুষ, তিনি হাফাচ্ছিলেন । লোকটার সাহস আছে । আমাকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত সাহায্য করে যাচ্ছিলেন । এর মধ্যে সাহায্যের জন্য আরো পুলিশ এসে গিয়েছে ।ধুধু ফাকা আবাদী জমির মধ্যে আমরা যতই আরাফাতকে শূন্য করে হাতে নিয়ে এগিয়ে যাই পায়ের নীচে তৈরী করা আবাদের জন্য মাটির বেড ততই নীচে ডেবে যেতে থাকে । আবশেষে পাকা রাস্তায় উঠে পুলিশের গাড়িতে মূমুর্ষু আরাফাতকে তুলে দিয়ে তার বাবাকে খবর দিয়ে এনে পুলিশের গাড়িতে করে পাবনা হাসপাতালে এস আই শরীফুলকে দিয়ে ওসি স্যার পাঠিয়ে দেন । আমরা আটককৃত রাব্বি,রাসেল এবং রাকিবদেরকে নিয়ে থানায় নিয়ে আসি । চলে জিজ্ঞাসাবাদ । জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসলো চাঞ্চল্যকর তথ্য ।
ভিকটিম আরাফাত তাহার চাকাওয়ালা কেডস কিছু মাস পূর্বে তার বন্ধু রাব্বির নিকট বাকীতে বিক্রী করে ২৫০০/- টাকায় । আরাফাত টাকা চাইতে থাকে কিন্তু রাফি টাকা দিতে পারে না । রাফির সখের অনেক গুলো কবুতর আছে । শেষে আরাফাত বলেছিল যে, রাফি তুই টাকা দিতে পারছিস না, তুই আমাকে কবুতর দে । কিন্তু রাব্বি কবুতর দিতে রাজি হয় না । এদিকে আরাফাত টাকার জন্য চাপ দিতেই থাকে । স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার মাঝে রাব্বি তার অপর দুই বন্ধু ‍রাসেল এবং রাকিব নিয়ে তৈরী করে ভয়ংকর পরিকল্পনা, আরাফাতকে শেষ করতে হবে তাহলে আর সে টাকা দিতে হবে না, যে করেই হোক আরাফাতকে কুশালের ক্ষেতে নিয়ে যাবে তারপর তাকে মারবে, যেই পরিকল্পনা সেই কাজ, সেদিনই রাব্বির বাড়িতে থাকা অনুমান ০১ ফুট দৈর্ঘ্যর লোহার তৈরী রড একটি বাজার করা ব্যাগে নিয়ে পূর্বেই ঘটনাস্থলে গিয়ে রেখে আসে। উল্লেখ্য ঘটনার বেশ কিছুদিন পূর্বে একই চেষ্টা করে রাব্বি কিন্তু সেটা ব্যর্থ চেষ্টা হয় কেননা আরাফাত ঐদিন সেখানে আখের ক্ষেতে যেতে রাজী হয়না । তারপর ১৫/১২/১৯ তারিখে বেলা ১২.০০ ঘটিকার দিকে রাব্বি আরাফাতকে বলে এক জায়গায় তুই কি যাবি? আরাফাত বলে, কোন জায়গায়? রাফি বলে, চলো যা্ওয়ার পর বলবো। তারপর রাব্বি রাসেল এবং রাসেল তিনজন মিলে আরাফাতকে কৌশলে উক্ত আখের ক্ষেতে নিয়ে যায় । আখের ক্ষেতে নিয়ে যা্ওয়া পর তারা সবাই আখ ভেংগে খায় । আরাফাতের থেকে রাব্বি খাটো হওয়ায় সে তাকে মাথায় আঘাত করতে সুযোগ পারছিলনা । তাই রাব্বি আরাফাতকে বলে, আখের গোড়ার দিকে যে নতুন কুশি বের হইছে তুই সেগুলো বসে থেকে ভেংগে নিয়ে বাড়িতে লেগে দে তাহলে সেগুলো আবার গাছ হবে । আরাফাত রাব্বির কথা মতো তাই করতে আখের গাছের গোড়ায় বসলে রাব্বি আরাফাতের পিছন হতে আগে থেকে আনা ব্যাগের মধ্যে হইতে সেই রড দিয়ে ক্রমাগত মারতে থাকে । আরাফাত চিৎকার করে বলে রাব্বি কি করলি? আরাফাত মাটিতে পড়ে যায় তার মাথা দিয়ে ঘেলু বের হয়ে যায়, কান কেটে যায় । আঘাত করা লোহার রড বাড়িতে আসার সময় রাব্বি একটি পুকুরে ফেলে আসে । অবশেষে রাব্বি জানায় সে এই পরিকল্পনা ক্রাইম পেট্টল সিরিয়াল থেকে শিখেছে । আরাফাতকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । সে এখনো শঙ্কা মুক্ত নয় । আরাফাত বেঁচে উঠুক সবার একই প্রত্যাশা।(আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশুদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে ।)
লেখক অসিত কুমার বসাক
এসআই
ঈশ্বরদী থানা পাবনা