তাহলে কি অজানাই থেকে যাবে আইএসের টুপি রহস্য!

12
Print Friendly, PDF & Email

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
গুলশান হলি আর্টিজান মামলার রায়ের দিন আদালতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান ও রাজীব গান্ধীর মাথায় আইএসের প্রতীক সম্বলিত টুপি কীভাবে এলো তা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আদালতও। যেদিন সারা বিশ্ব মিডিয়া তাকিয়ে ছিল এই রায়ের দিকে, সেদিনই এ ধরনের ঘটনার জন্ম দেশে জঙ্গির অস্তিত্বকে আবারও জানান দেয়।

হলি আর্টিজান হামলা নিয়ে প্রথম থেকেই বাংলাদেশ সরকার বলে আসছে, দেশে হঠাৎ উদয় হওয়া জঙ্গিদের সঙ্গে ইসলামিক স্টেট- আইএসের যোগসূত্র বা সংশ্লিষ্টতা নেই। এরা দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও দাবি করেন, দেশে কোনও আইএস নেই। এরা দেশীয় (হোমমেড) জঙ্গি। আইএসের সঙ্গে হয়তো যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি হলি আর্টিজান হামলা নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের ঘোষণাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পুলিশ-প্রশাসনের কোনও অংশ বা তাদের কেউ নিরাপত্তা বেষ্টনীকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে আসামিদের হাতে আইএসের টুপি তুলে দিয়েছিল?

গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, গুলশান হামলার রায়ের পরে নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরেই আদালতে জঙ্গিদের আইএসের লোগো-সম্বলিত দেয়া টুপি পরিয়ে বিশ্বকে বার্তা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে, তারা ওই সংগঠনেরই সদস্য।

জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে আদালতে নেয়ার সময় আসামিদের মাথায় কোনও টুপিই ছিল না, সেখানে দণ্ডিত হওয়ার পর কে বা কারা তাদের মাথায় আইএসের টুপি পরিয়ে দিল? কারা এটি সরবরাহ করল? তাহলে কি কারাগার থেকে আদালতে আনার সময় তল্লাশি ছাড়াই তাদের আদালতে আনা হয়েছিল, নাকি দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকাবস্থায়ই এই টুপি পেয়েছেন তারা। যদি কারাগারেও এ টুপি পেয়ে থাকেন তারা, তাহলে পেলেন কীভাবে?

এ ধরনের ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ দেশের প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। আঙুল উঠেছে তাদের দায়িত্বজ্ঞান ও কর্তব্যের দিকে। যদিও টুপি সরবরাহের দায়ভার নিতে রাজি নন কেউ। নিজেদের দোষ এড়াতে একে অপরকে দোষারোপ করছে প্রশাসন। ডিএমপি যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) ও জেলার মাহবুব আলম বলেন, কারাগার থেকে এ ধরনের কোনও টুপি পরে কেউ যায়নি। আসামিদের মধ্যে শুধু একজন আমাদের এখান থেকে সাদা টুপি পরে গেছে। বাকি সবার মাথা খালি ছিল। রায় ঘোষণার পর আসামিরা যখন কারাগারে এসেছে, তখনও তাদের কাছে কোনও কালো টুপি পাওয়া যায়নি।

ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কারাগার থেকে যখন প্রিজন ভ্যানে জঙ্গিদের আদালতে আনা হয়, তখন তাদের আশপাশে কোনও জনসাধারণ ছিল না। এমনকি ঘেঁষার কোনও রকম সুযোগও ছিল না। তাদের পাশে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই ছিলেন। আর তাতেই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ এই টুপি তাদের সরবরাহ করেছেন?
যদি অন্য কেউ এই টুপি দিয়েও যান, তাহলে এতো নিরাপত্তার মধ্যে কীভাবে এ ঘটনা ঘটল? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তখন মনোযোগ কোথায় ছিল? তারা কি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছিলেন না?

অনেকে মনে করেন, যে দেশের জেলখানায় টাকার বিনিময়ে ইয়াবা থেকে সবকিছু পাওয়া যায় সেখানে আইএসের টুপি দেয়া কোনও কঠিন বিষয় নয়।

আবার অনেকের অভিমত, বিএনপি সরকার থাকাকালীন অনেক জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীরা পুলিশে যোগদান করেছেন। তারা অনেককেই নাম-পদবি পরিবর্তন করলেও মানসিকভাবে আজও পরিবর্তন হয়নি। তাই তাদের কেউ আইএসের টুপি জঙ্গিদের দেয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এমনকি প্রশাসনের ভেতরেও আইএসের সদস্য থাকা অস্বাভাবিক বিষয় নয়।

তবে টুপি যেখান থেকেই আসুক এর দায়ভার কেউ নিতে রাজি নন। আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় কীভাবে ওই টুপি তারা পেলেন, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে।

পুলিশের উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) জাফর আহমেদ বলেন, ভেবেছিলাম ধর্মীয় টুপি। পরে বিষয়টি নজরে আসে। আদালত থেকে এ ধরনের টুপি আসামিদের হাতে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু বলেন, যেখান থেকে এদেরকে আদালতে আনা হয়েছে, এই টুপি কীভাবে পরল, এই জবাবটা তারাই দেবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, আমরা বিস্মিত হয়েছি। কারাগার থেকে আনার সময় আসামিদের তল্লাশি করে দেখা হয়। তাদের সঙ্গে কী আছে তা দেখা হয়। এ ধরনের টুপি তাদের কাছে কীভাবে গেল?

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম বলেছেন, হলি আর্টিজান হামলা মামলার রায়ের দিনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রিগ্যানসহ দুই জঙ্গির মাথায় যে টুপি ছিল সেটা কারাগার থেকেই এসেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। টুপিটা রিগ্যানের পকেটেই ছিল। তখন টুপিটার ওপর আইএস আদলে লেখাটা ছিল না। কিন্তু পরে সে টুপিটা উল্টে পরে আদালত চত্বরে প্রবেশ করে। তখন লেখাটা গণমাধ্যমে দৃশ্যমান হয়।

আইএসের টুপি মাথায় ফাঁসিদণ্ডপ্রাপ্ত রিগ্যান ও রাজীব গান্ধী

‘‘ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন দিয়েছে। তাকে আমি চিনি না। টুপিতে আরবিতে কলেমা শাহাদাৎ লেখা ছিল। তাই ভালো লাগায় পরেছিলাম’’
……….●●●……….
রিগ্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ:

আদালত প্রাঙ্গণে ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন তাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) লোগো সম্বলিত টুপি দিয়েছিলেন বলে আদালতকে জানায় জঙ্গি রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান।

৩ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে গুলশানের হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত রিগ্যান এ কথা জানায়।

রাজধানীর কল্যাণপুরে ‘জাহাজ বিল্ডিং’ জঙ্গি আস্তানার মামলায় চার্জশিটভুক্ত ১০ আসামির মধ্যে রিগ্যান একজন। ওই মামলায় রিগ্যানকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত আনা হলে বিচারক মজিবুর রহমান রিগ্যানের কাছে জানতে চান রায়ের দিন তার মাথায় আইএসের মনোগ্রাম সম্বলিত টুপি তিনি কোথায় পেয়েছিলেন।

জবাবে আসামি রিগ্যান বলে, ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন দিয়েছে। কে দিয়েছে বিচারক জানতে চাইলে জবাবে রিগ্যান বলে, তাকে আমি চিনি না। এরপর বিচারকের টুপি কেন নিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে রিগ্যান বলে, টুপিতে আরবিতে কলেমা শাহাদাৎ লেখা ছিল। তাই ভালো লাগায় পরেছিলাম।

এরপর বিচারক মজিবর রহমান জানতে চান আর কাউকে ওই টুপি দিয়েছে কি না? জবাবে রিগ্যান বলে, আর কাউকে দেয়নি। আমাকে দেয়া টুপিই প্রিজনভ্যানে জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী পরেছিল।

২৭ নভেম্বর (বুধবার) গুলশান হলি আর্টিজান হামলার মামলার রায়ের দিন এজলাসে জঙ্গি রিগ্যানের মাথায় আইএসের চিহ্ন সম্বলিত টুপি দেখার পর নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ওইদিন রায় ঘোষণার পর অন্যান্য আসামির সঙ্গে বের করে আনার সময় তার মাথায় আইএসের লোগোসহ টুপি দেখা যায়।

আইএসের লোগো সম্বলিত ওই টুপি কীভাবে গুলশান হামলার বন্দি আসামিরা পেল, তা খুঁজতে কারা কর্তৃপক্ষ ও ডিবি পুলিশ দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

কারা কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগার থেকে ওই টুপি নিয়ে যাননি আসামিরা। ডিবি পুলিশের তদন্ত কমিটি এখনও প্রতিবেদন দেয়নি।

আইএস টুপির রহস্য ভেদ করতে তদন্ত কমিটি গঠন করে কারা কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা মহানগর পুলিশ। এর মধ্যে কারা কর্তৃপক্ষ থেকে কোনও তথ্য না মিললেও একদিনের মাথায় গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, কারাগার থেকেই টুপিটি পকেটে করে নিয়ে এসেছিল রিগ্যান।

১ ডিসেম্বর (রোববার) একপর্যায়ে আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেই বসলেন, তাহলে আইএসের টুপি কি ফেরেশতা দিয়েছে নাকি শয়তান দিয়েছে?