মা-বাবার প্রতি সন্তানের কি কর্তব্য?

19

ইসলামিক নিউজ ডেস্কঃ
সন্তানের কাছে বাবা মা সবচে আপনজন, সবচে প্রিয়। এ জীবনের জন্য আমরা তাদের কাছে চির ঋণী। এই ঋণ কখনোই শোধ হবার নয়। তাই আমাদের উচিৎ মা-বাবার প্রতি আমাদের দায়িত্বগুলো যথাযথ পালন করা। সন্তান মায়ের পেটে থাকাকালীন মায়ের প্রচন্ড কষ্ট হয়। নয় মাস মায়ের পেটে থাকার পর সন্তানের পৃথিবী পৃষ্ঠে এলে মায়ের দ্বিগুণ কষ্টের সূচনা হয়। মা-বাবা এ অবুঝ শিশুকে বড় করে তোলেন। মা-বাবা কষ্ট করে টাকা উপার্জন করেন। সন্তানের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, অন্ন থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিস অকাতরে সন্তানের কল্যাণে বিলিয়ে দেন।

পবিত্র কুরআন মাজিদ বলছে আল্লাহর ইবাদাতের সাথে সাথে তোমরা পিতা-মাতার আনুগত্যও কর। সুরা বনী ইসরাঈলে সে বাণী ধ্বনীত হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘‘প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এ আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। তাদের মধ্য হতে যদি একজন কিংবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হয়, তখন তাদের ‘ওফ’ বলবে না (এমন আচরণ করবে না, যাতে তারা কষ্ট পেয়ে ওফ উচ্চারণ করে)। তাদের ধমক দেয়াও যাবে না। কথা বলার সময় যেন বিনয়ের সাথে সম্মান প্রদর্শন পূর্বক কথা বলো’’।

আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেন, ‘‘মানুষের প্রতি আমার(আল্লাহর) জোর নির্দেশ হচ্ছে-তারা যেন তাদের পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করে। কেননা তাদের মা পরম কষ্টে তাদেরকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দুবছর যাবত বুকের দুধ পান করিয়েছে। আমার নির্দেশ হচ্ছে- আমার প্রতি এবং তোমাদের পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। নিশ্চয় তোমরা একদিন আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করবে’’ (সুরা লুকমান)। কুরআনের এ বাণীও প্রমাণ করে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা মহান আল্লাহর অন্যতম নির্দেশ। সর্বাবস্থায় মাতা-পিতার প্রতি কৃৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে সেবা-শুশ্রূষা করা একান্ত কর্তব্য। কেননা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হলো কারো সাহায্যের প্রতিদানে তার সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া। অতএব, পিতা-মাতা যেভাবে ছোটকালে সন্তানের যত্ন নিয়েছেন, সন্তানেরও উচিৎ বৃদ্ধাবস্থায় মা-মাবার তেমন যত্ন নেয়া। রাসুলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনেক হাদিসের মধ্যে পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালনে জোর দিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন, সর্বোপরি নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একবার রাসুলে মকবুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা উত্তম আমলটি কী’? রাসুলে আকরাম জবাব দিলেন, ‘সময় মত নামাজ আদায় করা’। পুণরায় জিজ্ঞেস করা হল, ‘এরপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা’। আবারো প্রশ্ন করা হল, ‘অতঃপর কোনটি?’ জবাব এলো, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা’ (বুখারি ও মুসলিম)

মৃত্যু পর কি পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্যঃ
হ্যাঁ, জীবিত অবস্থায় যেমনিভাবে উভয়ের প্রতি নানাবিধ কর্তব্য রয়েছে, তেমনি মৃত্যুর পরেও কিছু কর্তব্য রয়েছে। যেমনটি হযরত আবু উসায়েদ সায়েদি (রা.) এর হাদিসে পরিলক্ষিত হয়। তিনি বলেন, ‘একদা বনু সালমা গোত্রের একলোক রাসুলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুল্লাল্লাহ! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের উপায় আছে কী? রাসুলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যুত্তরে বললেন অবশ্যই আছে। আর তা হলো- ‘তাদের জন্য দোআ করা, মাগফেরাত কামনা করা, কৃত অঙ্গীকার পূরণ করা এবং তাদের আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সদ্ব্যবহার করা’ (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী নিম্মোক্ত কাজসমূহ তাদের মৃত্যুর পর সন্তানের উপর কর্তব্য:

(১) মৃত্যুর পরবর্তী তাদের প্রতি প্রথম কর্তব্য হলো গোসল, জানাজা, কাফন-দাফন ইত্যাদি সমাপ্ত করা।
(২) সর্বদা তাদের জন্য দোআ ও মাগফেরাত কামনা করা।
(৩) তারা যদি কোন ঋণ রেখে যায়, যত দ্রুত সম্ভব, তা পরিশোধ করা।
(৪) শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়, এমন অসিয়ত যদি তারা করে যান, সেটা পূর্ণ করা।
(৫) তাদের উভয়ের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধুবদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখা, যেমনি ভাবে তারা রাখতো।
(৬) তাদের কবর জিয়ারত করা এবং ঈসালে সাওয়াব পৌঁছানো।
(৭) তাদের কৃত শপথ পালণ করা এবং যথাসম্ভব তাদের অনাদায়কৃত ইবাদাত আদায় করা। যেমন- কারো হজ্ব ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যদি আদায় না করে মারা যায়, তবে তার পক্ষ থেকে তা আদায় করা।

মা-বাবা এক কথায় অন্যরকম আবেগের নাম। তারা আমাদের জন্য কষ্ট, শ্রম, ভালবাসা, দোয়া দিয়েছেন, তারই প্রতিফলনে আল্লাহ আমাদের আজ এ অবস্থায় এনেছেন। এ ঋণ কি আর শোধ হয় কখনো? আল্লাহ আমাদের সকলের মা-বাবাকে ভাল রাখুন, মারা গেলে জান্নাতের সাথে তাদের সম্পর্ক করে দিন। আমীন।