হেগে নির্বাক সু চি, ক্যাম্পে ন্যায়বিচার চেয়ে রোহিঙ্গাদের বিলাপ

9
Print Friendly, PDF & Email

সিনিয়র করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) যখন বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের শুনানি শুরু হয় তখন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি ছিলেন কার্যত নির্বাক। ঠিক ওই সময়ে তখন বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয় ক্যাম্পগুলোর মসজিদ, মাদরাসা ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চলছিল বিশেষ মোনাজাতে রোহিঙ্গাদের বিলাপ। অনেক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ শুনানি চলাকালীন তিন দিন ধরে রোজাও রাখছেন।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ২৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল। প্রথম দিনের শুনানিতে আদালতের পক্ষ থেকে যখন রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত সেদেশের সামরিক বাহিনীর একের পর এক নৃশংসতার ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছিল তখন সেখানে পাথরের মতো মুখ করে বসে ছিলেন অং সান সু চি।

দ্য হেগ শহরের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। দেশটির বিচার-মন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদু শুনানির শুরুতে বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচার হত্যার প্রশ্নে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতেই তার দেশ আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত বা আইসিজেতে এই অভিযোগ এনেছে।

‘সারা বিশ্ব কেন এখন নীরব দর্শক? কেন আমাদের জীবদ্দশাতে এটা আমরা ঘটতে দিচ্ছি?’ তিনি বলেন, ‘সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। আসলে এখানে বিচার চলছে আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার।’ শুনানির প্রথম দিনে বাদীপক্ষের বক্তব্য শোনা হচ্ছে। মিয়ানমার এসব অভিযোগের জবাব দেবে আগামীকাল বুধবার। এরপর বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের মধ্যে যুক্তি-তর্ক হবে।

দ্য হেগ থেকে বিবিসির খবরে বলা হচ্ছে, প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে সু চি যে যুক্তি দেখাবেন সে বিষয়ে বিচার করার অধিকার আইসিজের নেই। শুনানিতে বক্তব্য রাখার সময় গাম্বিয়ার নিযুক্ত একজন কৌঁসুলি অ্যান্ড্রু লোয়েনস্টিন রাখাইনের মংডু শহরে বেশ কয়েকটি পাইকারি খুনের বিবরণ পেশ করেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, যাকে টাটমাডাও নামেও ডাকা হয়, ঐ শহরের শত শত রোহিঙ্গা বেসামরিক পুরুষকে হত্যা করে এবং নারীদের ধর্ষণ করে।

আইসিজের ওয়েবসাইট থেকে লাইভ স্ট্রিম করা শুনানিতে এসব বিবরণ যখন পড়ে শোনানো হচ্ছিল তখন অং সান সু চির মুখে কোনো অভিব্যক্তি লক্ষ করা যায়নি। কখনও সোজা সামনে তাকিয়ে, কখনও নিচে মাটির দিকে তাকিয়ে তাকে বাদী পক্ষের বক্তব্য শুনতে দেখা যায়। শুনানির প্রথম দিকে গাম্বিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে, আদালতের কাছ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ লাভ করা।

ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বিশেষ মোনাজাত

উদ্দেশ্য, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা রয়ে গেছেন তাদের ওপর যে কোনো ধরনের নির্যাতন না চলে, তা সুনিশ্চিত করা। পাশাপাশি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ধ্বংস করার বিরুদ্ধেও ঐ আদেশ কার্যকরি হবে বলে বাদীপক্ষ আশা করছে।

এদিকে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর প্রায় মসজিদ, মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আজ মঙ্গলবার ফজরের নামাজ থেকে প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজে শত শত রোহিঙ্গা নামাজ শেষে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিচ্ছেন। পুরুষরা মসজিদে আর মহিলারা ঘরে ঘরে এ ধরনের দোয়া ও মোনাজাত করছে বলে রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার নুরুল আলম জানান।

মাস্টার মো. রফিক জানান লাখ লাখ অসহায় রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশ, গাম্বিয়াসহ বিশ্বের সকল মানবতাবাদী দেশ, গোষ্ঠী, সংগঠন যারা রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করছে তাদের জন্য দোয়া করা ছাড়া আর কী করার আছে! আইসিজের বিচারে যেন রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা সঙ্গে দেশে ফিরে যেতে পারে সেই কামনা নিয়ে রোহিঙ্গারা বিলাপ করে কান্নাকাটি করছে। অনেকে মানত করে রোজা রাখছে যেন সংকটের আশু সমাধান হয়। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ বিশেষ প্রার্থনা চলবে বলে রোহিঙ্গা নেতারা জানান।

অক্সফোর্ডের ট্রিনিটি কলেজের আইনের অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেন, আদালত এই রায় দেবে কি দেবে না, সেটা নতুন বছরের শুরুর দিকেই জানা যাবে। এটা এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। এই মামলাটির নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। কিন্তু গোড়ার দিকেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরের রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা বিধানের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র বিবিসি, রয়টার্সসহ বিশ্ব গণমাধ্যম।